ক্রাইম রিপোর্টার: মোঃ আতিকুর রহমান
তারিখ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় অনলাইন জুয়া এখন নীরব ঘাতকের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ডিজিটাল ক্যাসিনো ও বেটিং সাইটের মরণনেশায় পড়ে শত শত পরিবার নিঃস্ব হওয়ার পথে। সহজে টাকা আয়ের প্রলোভনে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় জুয়া সিন্ডিকেট স্মার্টফোনকে ব্যবহার করছে ধ্বংসের হাতিয়ার হিসেবে। ফলে আশীর্বাদ হয়ে আসা প্রযুক্তিই অনেক পরিবারে আজ অভিশাপে পরিণত হয়েছে।
এক ক্লিকেই ভাগ্য বদলের লোভে পড়ে শিক্ষার্থী, বেকার যুবক, কৃষক ও দিনমজুর—কেউই রেহাই পাচ্ছে না। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে বিক্রি হচ্ছে গরু, জমি, মায়ের গহনা এমনকি বসতভিটাও। দেনার দায়ে অনেক তরুণ এলাকা ছাড়ছে, বাড়ছে পারিবারিক কলহ, অপরাধ প্রবণতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত:
স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ছেড়ে দিনরাত অনলাইন জুয়ার সাইটে আসক্ত হয়ে পড়ছে। টিউশন ফি, পরিবারের সঞ্চয়—সবই চলে যাচ্ছে জুয়ার পেছনে। এক নিঃস্ব কৃষক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“ছেলের পড়াশোনার জন্য জমি বর্গা দিয়েছিলাম, সে সব টাকা জুয়ায় শেষ করে এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে।”
মোবাইল ব্যাংকিং হয়ে উঠেছে জুয়ার হাতিয়ার:
বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অনায়াসে বিদেশি সার্ভারে টাকা পাচার হচ্ছে। ‘ইনভেস্ট করলেই দ্বিগুণ লাভ’—এই ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
গোদাগাড়ীতে সক্রিয় অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এলাকায় সক্রিয় রয়েছে—
1xBet (ক্রিকেট ও ফুটবল বেটিং)
MCW (Mega Casino World)
Jetbuzz, Baji999, Velki
10wiket, Baajiwala, Darazplay
ডোমেইন পরিবর্তন করে এসব সাইট নিয়মিত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও এজেন্ট চক্র
বিশেষ করে গোদাগাড়ী পৌর এলাকার হাটপাড়া, মহিশালবাড়ি, ফাজিলপুর, সুলতানগঞ্জ, মেডিকেল মোড় ও লালবাগ গোগ্রাম এলাকায় জুয়ার প্রকোপ বেশি। অভিযোগ রয়েছে, হাটপাড়া এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্র স্থানীয় শিক্ষিত যুবকদের ‘এজেন্ট’ বানিয়ে গোপনে জুয়ার আইডিতে টাকা (ডিপোজিট/পয়েন্ট) লোড করছে। প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
মাদকের চেয়েও ভয়ংকর নেশা:
সচেতন মহলের মতে, অনলাইন জুয়া মাদকের চেয়েও ভয়াবহ। দীর্ঘ সময় জুয়ায় আসক্ত থাকলে মানসিক অস্থিরতা ও বিকৃতি তৈরি হয়। টাকা শেষ হলে চুরি, ছিনতাই, সুদের টাকা ও মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে অনেকেই। এর পরিণতি—পারিবারিক বিচ্ছেদ ও আত্মহত্যা।
সিআইডির অভিযান ও কঠোর আইন:
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে অনলাইন জুয়ার লেনদেনে জড়িত থাকার অভিযোগে ১,০০০-এর বেশি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট শনাক্ত হয়েছে।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী—
জড়িত এজেন্টদের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ
সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড অথবা ১ কোটি টাকা জরিমানা (বা উভয় দণ্ড)
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি:
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা দ্রুত চিহ্নিত স্পট ও এজেন্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, এখনই লাগাম না টানলে গোদাগাড়ীর একটি পুরো প্রজন্ম অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হবে।

নিউজ ডেস্ক।।
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৬ । ৬:৩৬ অপরাহ্ণ